আমার মুক্তিযুদ্ধ ১
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আমরা পাকশী তে ছিলাম। পাকশী সে সময় খুব ছোট একটি রেলওয়ে শহর। রেলওয়ে শহর বলছি এজন্য যে মূলতঃ রেলওয়ে ডিভিশনাল অফিস কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল পদ্মা তীরের এই শহরটি। পাশেই ছিল হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। আমার বাবা ছিলেন সেখানে ডিভিশনাল সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ার।
ব্রিটিশ রেলওয়ের ঐতিহ্য এর ধারাবাহিকতায় সেখানে সাহেব পাড়া, বাবু পাড়া ছিল। ক্লাব ছিল, ডিনার ছিল, নারী কল্যাণ সমিতি ছিল। বাঙালি ও অবাঙালি কর্মচারী, কর্মকর্তা রা ছিল। অবাঙালিরা বেশির ভাগই এসেছিলেন বিহার বা উত্তর প্রদেশ থেকে ৪৭ এর পর। আপাত: শান্ত শিষ্ট এই পরিবেশ টিও সমসাময়িক পরিস্থিতিকে ধারণ করতো। পদোন্নতি বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অবাঙালিদের বেশি সুযোগ দেয়া নিয়ে অসন্তোষ ছিল। বাঙালি সাংস্কৃ তি কে বুঝতে না পেরে অনেক সময় অবাঙালিরা বাঁকা কথা বলতো। এই নিয়ে চাপা ক্ষোভ কাজ করতো। নির্বাচনের সময় বাঙালি দের মধ্যে উত্তেজনা ছিল, সরকার গঠন নিয়ে বাংলোর সামনে বা ক্লাবে আলোচনা ছিল।
আমাদের বাসায় ম্যাপ ওয়ালা বাংলাদেশের পতাকা ছিল। আলোচনা ছিল। যা যা তখনকার বাঙালি পরিবারে হতো। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি অন্য রকম হচ্ছে টের পাওয়া যাচ্ছিলো। মাঝে মধ্যে মিছিল সাহেব পাড়ায় ঢুকে পড়তো। স্থানীয় নেতারা বলতেন অফিসার রা "আমাদের সহযোগিতা করুন। আমরা যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন করে যাবো।" কিন্তু ২৬ মার্চ এর পরে সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেলো। স্থানীয় নেতারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চলে গেলেন। ছোট্ট অফিসার পাড়ায় প্রতিদিন আলোচনা হতো। রেডিও শোনা হতো। এর মধ্যে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে খবর আসতে লাগলো যে ঈশ্বরদী এবং সৈয়দ পুরে অবাঙালি কর্মচারীরা বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারীর উপর চড়াও হচ্ছে। হত্যা, গুমের খবর পাওয়া যাচ্ছে। একদিন ভোর বেলা উঠে দেখা গেলো তিনটি বাঙালি অফিসার পরিবার চলে গেছে। আর তিনটি পরিবার রয়ে গেছে। পরবর্তীতে আমার মা জিজ্ঞেস করেছিলেন 'আমাদের জানান নি কেন?' "খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সময় পাই নি"। বলাবাহুল্য ফেলে যাওয়া এই তিনটি পরিবার বিভিন্ন ভাবে বিপন্ন ছিলেন- কারো সন্তান সংখ্যা বেশি, কারো বৃদ্ধা অসুস্থ মা কারো অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। এদের মধ্যে আমরা ছিলাম। উপায়ন্তর না দেখে এই তিনটি পরিবার মোটর ট্রলি চালিয়ে কাছাকাছি এক গ্রামে চলে গেলেন। আমাদের সেই চাচার বৃদ্ধা মা বললেন "তোমরা যাও, আমার কিছু হবে না।" কিছুদিন পর খবর পেয়েছিলাম যে সেই ভদ্র মহিলাকে বাথরুমে মৃত পাওয়া গিয়েছিলো। হয়তো তিনি গোলাগুলির শব্দে ভয়ে বাথরুমে লুকিয়েছিলেন। আচ্ছা বলুনতো এটি যদি আপনার দাদু, মা বা শাশুড়ী হতেন তাহলে আপনি কি করতেন? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা কঠিন। যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করা সোজা নয়।
আমার মুক্তিযুদ্ধ ২
এরপর আড়াই মাস মাস আমরা ঠিকানা হীন ভাবে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে ঘুরে বেড়ালাম। আহ মানুষের সে কি আন্তরিকতা। কেউ কাউকে চিনে না। ঢালাও বিছানা পেতে শুয়ে আছি। চিড়া মুড়ি ভাগ করে খাচ্ছি। অবশেষে আমরা পাবনায় আসলাম। পিতা সিদ্ধান্ত নিলেন আমরা বাসে করে ঢাকায় রওনা হবো। যা থাকে কপালে। আমরা যে পরিবারটির আশ্রয়ে ছিলাম তারা কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বাসে তুলে দিলেন। তাদের সাথে এখন আমাদের যোগাযোগ নেই, বহুদিন। অথচ সেদিন তারা কেঁদেছিলেন। ফেরি পারাবারে সময় ঘাটে আমার বাবা প্রথম interrogation এর সম্মুখীন হলেন।
ঢাকা গামী বাস ভর্তি অবাঙালি ছিল। শুধু ছয়/সাত জন বাঙালি যাত্রী ছিল। আমার মার মুখে শুনেছি সারাক্ষন একটি অবাঙালি যুবক বাঙালিদের গালি দিচ্ছিলো। "ঢাকা ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেয়া উচিত। বাঙালিরা সব সন্ত্রাসী ইত্যাদি।" গা গরম হয়ে গেলেও চুপ করে শোনা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ফেরি ঘাটে বাস থামানো হলো। কয়েকজন আর্মি সদস্য বসে উঠে সমস্ত বাঙালি পুরুষদের নামিয়ে নিলো। লাইন করে দাঁড় করলো। সে দৃশ্য আমার মনে আছে। আমরা জানালা দিয়ে দেখছিলাম। আমার বাবাকে দাঁড় করিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছিলো এবং বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিলো। শুনেছি তিনি নিজেকে তৃতীয় শ্রেণীর একজন কর্মচারী বলেছিলেন যে ঢাকায় মার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। তল্লাশির পর তারা সবাইকে ছেড়ে দেয় শুধু একজন কে আলাদা করে রাখে যে পরিবার ছাড়া একা যাচ্ছিলো। এই ভদ্রলোকের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা আমরা আর জানতে পারি নি কারণ তাকে ছাড়াই আমাদের বাসকে ফেরিতে উঠতে হয়েছিল।
আমরা আক্ষরিক অর্থে এক বস্ত্রে ঢাকা এলাম। ঢাকায় ঢোকার সময় মীরপুরে একদল লোক "রোককে রোককে" বলে হাত দেখিয়েছিলো। আমাদের অবাঙালি সহযাত্রীরাও অনেকে ওখানে নামতে চাইছিলো। কিন্তু বাসের বাঙালি চালক বললেন তার স্টোপেজ মতিঝিলে তার আগে কোথাও থামা নিষেধ আছে। বলে টেনে চলে এলেন মতিঝিলে।
গণকটুলিতে দাদির বাড়িতে তালা ঝুলছে। অবাঙালী প্রতিবেশী মহিলা জানালেন আমার দাদী ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথায় গেছে তারা জানেন না। আজকের দিনে বুঝতে কষ্ট হবে। নিজেকে আমরা কি ওই জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে পারি এখন? এপ্রিল মাসে আমরা ঘর থেকে বের হবার পর জুনে ঢাকায় ঢোকা পর্যন্ত আমাদের দাদী, নানা, নানী, অন্য ভাই বোন কেউ জানে না- আমরা কোথায় আছি তারা কোথায় আছে। কে বেঁচে আছে কে নেই।
আমরা গণকটুলির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম 'এখন কোথায় যাবো?' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় চাচার ওখানে যাবার প্রশ্নই উঠে না। আর তিনি নিশ্চয়ই এখন সেখানে নেই। আমরা ইন্দিরা রোডে আমার ডাক্তার চাচার বাসার সামনে দাঁড়ালাম। ইন্দিরা রোডে আমাদের আরো আত্মীয় থাকতেন। তারা দৌড়ে আমাদের দেখতে এলেন। 'তোমরা বেঁচে আছো?' এই একটি প্রশ্ন চোখের পানির জন্য যথেষ্ট ছিল।
শুরু হলো আমাদের ঢাকার জীবন। বড়োরা রাতে কানের কাছে রেডিও লাগিয়ে জয় বাংলা শুনতো আর সকালে উঠে অফিস আদালতে যেত। বিচ্ছুরা কোনো কিছু করেছে শুনলে সবার মধ্যে চাপা উল্লাস কাজ করতো।
আমার নানার খবর পাওয়া গেলো। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ এবং আমার নানা (Joint DC Revenue) সীমান্তের ওপারে মুজিবনগর সরকারে যোগদান করেছেন এবং আমার দুই মামা মুক্তিবাহিনীতে আছেন। রেডিও তে রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার জন্য এই ধরণের সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ঘোষণা করা হলো। তাদের অনুপুস্থিতে বিচার ও শাস্তি হলো - যাবৎ জীবন কারাদন্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। আমার নানার নাম যেদিন বলা হলো সবাই আমার মায়ের কাছ থেকে সে কথা লুকিয়ে রাখলেন। কিন্তু আমার মায়ের এক নানী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। "ও মায়া, শুনছো নাকি দ্যাশ স্বাধীন না হইলে বলে তোমার বাপে আর ফিররা আইতে পারবো না? আইলেই ধইরা ফেলবো।" আমার মা কাঁদতে লাগলেন।
এই অবস্থায় আমার বাবা জুলাই মাসে আবার join করার সিদ্বান্ত নিলেন। দেশে থেকে absconding থাকাটা কষ্ট সাধ্য ছিলো। পাকশী তে গেলেন কিন্তু সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হলো। খুব তাড়াতাড়ি তাকে ফিরে আসতে হলো।
মাঝে মধ্যে ই গেরিলারা রেল সংযোগ বিছিন্ন করে দিচ্ছিলো। এসব ঘটনা ঘটলেই আর্মিরা এসে হম্বি তম্বি করতো। আমার বাবা join করার দু সপ্তাহের মাথায় একবার আর্মিরা তাকে ক্যাম্পে তলব করলো। একজন কর্নেল আমার বাবাকে সামনে দাঁড় করিয়ে রেল সংযোগ অক্ষত রাখার ব্যাপারে রেল কর্মকর্তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিলেন। এই সমস্ত সময় তার দিকে অস্ত্র তাক করা ছিল। এক পর্যায়ে কর্নেল আমার বাবার পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমার বাবার রক্ত হিম হয়ে গেলো। তার মনে হলো এরা আমার নানার কথা জানে। তিনি শুধু বললেন 'আমার স্ত্রী ঢাকায় আমার মার কাছে আছে।' কর্নেল আমার বাবাকে যেতে দিলো। ক্যাম্প থেকে বের হয় পর্যন্ত অস্ত্র তাক করা ছিল। আমার বাবার প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিলো এখনই গুলিটা হবে।
ক্যাম্প থেকে বের হয়ে প্রথম সিদ্ধান্ত হলো "enough, আর এই চাকুরী করা যাবে না." বড়োবাবুর (হেড ক্লার্ক) এর হাতে তিন দিনের ছুটির দরখাস্ত ধরিয়ে আবার পরবর্তী পাঁচ মাসের জন্য আমার বাবা absconding হয়ে গেলেন।
আমার মুক্তিযুদ্ধ ৩
ছুটির দরখাস্ত ধরিয়ে দিয়ে আমার বাবা ঢাকার দিকে রওয়ানা হলেন। নগর বাড়ির পর থেকে বাসে আসতে হলো। এবার তাকে মিরপুরের কাছে কোথাও নামিয়ে দেয়া হলো। তিনি বেবি ট্যাক্সি ঠিক করতে যাচ্ছেন এমন সময় দু তিন জন অবাঙালি যুবক তাকে ঘিরে ফেললো এবং ছুড়ি ধরে এক কোনায় ধরে নিয়ে গেলো। তারা তার গলায় ছুড়ি ধরলো এবং মেরে ফেলার হুমকি দিলো। আমার বাবা বললেন তিনি সরকারি চাকরি করেন এবং ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু তারা উর্দুতে বলতে লাগলো "তুমি মুক্তি, তোমার পকেটে কি আছে বের করো।" তারা তার জামা কাপড় ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করলো। আমার বাবার কাছে মাত্র ৫০ টাকা পাওয়া গেলো। "ছেড়ে দে" (উর্দুতে)। আমার বাবা পিছন দিকে তাকিয়ে দেখেন এক বৃদ্ধ অবাঙালি লোক বসে আছে। সেই এই নির্দেশ দিচ্ছে। তারা সেই পঞ্চাশ টাকা রেখে দিয়ে বাবাকে ছেড়ে দিলো। এর কারণ কি তা আমার বাবা বলতে পারেন না। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি পথচারী বা যাত্রীদের ভয় দেখিয়ে টাকা পয়সা আদায় করা। অথবা এমন হতে পারে তারা মেরে ফেলতো কিন্তু আমার বাবার উর্দু শুনে বা অন্য কোনো কারণে তাদের সর্দার ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
আমি আমার পরিবারের গল্প বলে যাচ্ছি। আমাদের চেয়ে অনেক কঠিন অভিজ্ঞতা চারপাশে ছিল। আমার মনে হয় সেই সব পরিবারগুলো নিজেরা ও এখন ভাবতে পারে না কেমন করে তারা সেই সব দিন পার করেছিল।
আমি ভাবতে পারি না, আমার যে আন্টির একমাত্র ছেলে এবং স্বামী কে অবাঙালিরা পাহাড়তলীতে জবাই করে হত্যা করেছিলো, তিনি কেমন করে সেই সময় পাঁচটি মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে তার শ্বশুরালয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আমার মাকে বলেছিলেন "আপা সেই সময় আমার মাথা কাজ করছিলো না। আমার স্বামী আর ছেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি মেয়েদেরকে outhouse এ চৌকির নিচে ঢুকিয়ে চাদর দিয়ে ঢাকছি। আমার মাথায় তাদের সম্ভ্রম এর কথা কাজ করছে।"
স্বামী কে CRB (Central Railway Building) থেকে আর্মিরা ধরে নিয়ে যাবার সংবাদ পাবার পর শফি আন্টি তৎক্ষণাৎ রেলওয়ের চেয়ারমেন এর বাড়িতে গিয়েছিলেন - নিশ্চয়ই তিনি তার অধঃস্তন কর্মকর্তার খোঁজ জানবেন। বাড়ীর দরজা পর্যন্ত খোলা হয় নি। বলা হয়েছিলো যে একজন মহিলার এরকম সময় বাড়ি বাড়ি ঘোরা উচিত নয়। বলা বাহুল্য ঘোরা বলতে CRB এর এই বাংলো থেকে ওই বাংলো। আমার এই আন্টির উল্লেখ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি বইতে আছে।
প্রতিটি পরিবারের নিজের গল্প আছে। আমরা সবাই লড়াই করছিলাম।
নভেম্বর এর দিকে কোনো এক সময় আমরা গ্রামের বাড়ি রওয়ানা হলাম। এর মধ্যে ঢাকায় আমরা তিন জায়গায় থেকেছি। ইন্দিরা রোড, রাজা বাজার আর বক্শি বাজারে। গ্রামে যাওয়া সাবস্ত হয়েছিল কারণ শোনা যাচ্ছিলো ঢাকায় বোমা পড়বে। আমরা যাবো শাইন পুকুর। এটা ঢাকা জেলার দোহারের একটি গ্রাম। পদ্মার তীরে অবস্থিত। সদর ঘাটে গিয়ে দেখা গেলো কোনো লঞ্চ ছাড়বে না। আমাদের সাথে যারা ছিলেন তারা ফিরে যেতে চাইলেন না। একটা নৌকা ঠিক হলো। আমি জানি না কেমন করে তখন নদী পথে দোহার যাওয়া হতো। এখন যাওয়া যায় কিনা তও জানি না। কারণ এখন আমরা সড়ক পথে যাই। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরীর উপর একটার পর একটা সেতু পার হয়ে গাড়ি নিয়ে বাড়ির দোরগোড়ায় নামি। কিন্তু ৪৭ বছর আগে ব্যাপার অন্য ছিল।
আমার মুক্তিযুদ্ধ ৪
যে গ্রামে যাচ্ছিলাম সেটা আমার নানা বাড়ি। আমার বাবা আমাদের সাথে ছিলেন না, তিনি আগেই চলে গিয়েছিলেন। আমাদের সাথে ছিলেন আমার দুই মামা, এদের মধ্যে একজন আমার মায়ের মামাতো ভাই, তার স্ত্রী এবং এক বোন। পাঁচ বছরের শিশুর জন্য এই নৌকা ভ্রমণ খুবই রোমাঞ্চকর ছিল। আমার মামা কেমন সুন্দর নৌকার ছৈ এ বসে আছেন। আমার ইচ্ছে করছিলো ওখানে বসি। কিন্তু মা অনুমতি দিচ্ছিলো না। এ নৌকার মাঝি হাঁক ডাক দিয়ে ওই নৌকার মাঝির সাথে কথা বলে। খুবই মজার ব্যাপার।
বিকেলের দিকে নৌকা একটা অপেক্ষাকৃত সরু নৌপথ অতিক্রম করছিলো। দুপাড়ের গাছপালা দেখা যাচ্ছিলো। এমন সময় কোনো এক পার থেকে ফাঁকা গুলি করা হলো। "কেডা যায়? আজকে সরকার নদীপথে কার্ফু দিছেন, তারপর ও কারা যায়?" আমার মনে আছে আমার দুই মামা পানিতে নেমে হাত উপরে তুললেন। "গুলি ছুইরেন না. আমাদের সাথে মহিলা আর বাচ্চা আছে। আমরা শাইনপুকুর মিয়া বাড়ি যাই। আমরা ওই বাড়ির ছেলে।" 'কার্ফু জাইন্না রওনা দিলেন ক্যান' "আমরা জানতাম না ভাই, আমাদের দাদি খুব অসুস্থ তারে দ্যাখতে যাই"। এইরকম কথা বার্তা চলার পর এক বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে আসলেন। তিনি বললেন যে তারা যদি ছেড়েও দেন, এরকম আশংকা খুবই প্রবল যে সামনের কোনো ঘাঁটিতে আমাদের থামিয়ে দেয়া হবে - এমনকি মিলিটারির কাছেও নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তাই এইটা ভালো সিদ্ধান্ত হবে যদি আমরা সেই রাতে তাদের বাংলা ঘর (কাচারী ঘর বা বৈঠক খানা) এ থেকে যাই। আমরা তাই করলাম। সেই রাত সেখানে কাটিয়ে আমরা পরের দিন সকালে আবার শাইনেপুকুরে রওনা হলাম।
আমি যদি তরুণী আমি থাকতাম সে সময় তাহলে আমি কি করতাম? চিৎকার করতাম? "শালা রাজাকারের বাচ্চা, তুই হুকুম দেবার কে? নদীতে কার্ফু দেয় কেন মিলিটারি? আমার দেশ, আমার নদী আমার বিচরণ কোন শালা বাধা দেবে?" কে জানে হয়তো করতাম, হয়তো করতাম না।
শাইনপুকুর পর্যন্ত যাওয়া অবধি আরো ঘটনা ঘটেছিলো। নৌকা চরে আটক পড়েছিল। আমার মামা মামীকে কোলে করে চরের অংশ পার করেছিলেন। সেটা আমার জন্য ব্যাপক মজার ব্যাপার ছিল।
আচ্ছা, আপনারা এরকম কিছু জানেন কি রাতের বেলায় চরে কোনো শব্দ খুব জোরে শোনা যায়? দূরে কোনো নৌকায় কেউ কথা বলছে বা পারে কোনো কথা হচ্ছে অনেক জোরে শব্দ ভাসতে থাকে। আমার যেন মনে হয় আমি সেরকম কিছু শুনেছিলাম আর ভয় পেয়েছিলাম। কে জানে হয়তো শিশু মনের কল্পনা। আমার মা বলেছিলেন যে তারা আটক পরে ডাকাতির ভয় করেছিলেন।
বিমান যুদ্ধ নিয়ে বড়দের মধ্যে উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা থাকলেও গ্রামে ছোটদের দিনগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল। উঠান ছিল, মাঠ ছিল দৌড়া দৌড়ি করে খেলা যেত। পাটকাঠির ডগায় ছোট্ট পতাকার মতো কাপড় নিয়ে "জয় বাংলা" "জয় বাংলা" বলে সারা উঠান ঘুরা যেত। মাঝে মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাও হতো।
কিন্তু বড়োরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কতদিন যুদ্ধ চলবে? নদী দিয়ে মিলিটারি এসে উঠবে নাতো? বিমান যুদ্ধে কোথায় কোথায় বোমা পড়তে পারে? নিয়মিত স্বাধীন বাংলা বেতার শোনা হতো। যাদের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো তারা ছেলেদের একটু খবরের জন্য উন্মুখ থাকতেন।
পদ্মার পার থেকে একটা খাল গ্রামের মাঝ বরাবর ছিল। শীত কালে খাল টা শুকিয়ে যেত। তখন সেটা দিয়ে হাঁটাচলা করা যেত। এখন আর সেই খালটা নেই। একদিন দেখলাম সেই খাল দিয়ে অনেক লোক একসাথে মিছিল করে যাচ্ছে। হাতে পতাকা। সবাই আনন্দ করছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমিও তাদের সাথে সাথে রওয়ানা হলাম। চারিদিকে আনন্দ - সে আনন্দ শিশু আমাকে স্পর্শ করছিলো।
সবাই মিছিল করে শহীদ রাজুর মায়ের সাথে দেখা করতে গেলো। দশম শ্রেণীর ছাত্র শহীদ রাজু সহযোদ্ধাদের সাথে শ্রীনগর থানা দখল করতে গিয়েছিলো এবং সেখানে সে শহীদ হয়। মিছিলটি শহীদ রাজুর মায়ের বাড়ির সামনে শেষ হয়। সেটা অন্য পাড়া, চারিদিকে চেয়ে দেখি কাউকে চিনি না। এখন বাড়ি যাব কিভাবে? হঠাৎ আমার এক খালা খপ করে আমার হাত ধরলেন "এই তুমি এখানে কি করো? হারায়ে যাবে তো।"
এবার বাড়ি ফেরার পালা। পাকশীতে আমাদের বাসার সব কিছু লুট হয়ে গিয়েছিলো। অলংকার থেকে শুরু করে খাট পালঙ্ক পর্যন্ত। আমার মা, বাবার শিক্ষা গত কিছু সার্টিফিকেট বাড়ির পিছনে কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিলো। ব্যাস ওই পর্যন্ত। আর কিছু ছিল না। মাটিতে বিছানা করে শোবার মতো অবস্থা। প্রাথমিক পর্যায়ে আমাকে আজিমপুর গার্ল্স স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো। সেখানে একদিন লাইনে এ দাঁড় করিয়ে সবাইকে গুঁড়া দুধ আর জামার কাপড় দেয়া হলো। লাল জামার কাপড় আমার খুব ভালো লাগলো। আমি মায়ের কাছে বায়না ধরলাম জামা বানিয়ে দিতে। মা দেখলেন রিলিফের কাপড়, বালিশের কাভার বানানোর উপযুক্ত তবু একটা ফ্রক বানিয়ে দিলেন বহু কষ্টে - আমার মায়ের সেলাইয়ের কল লুট হয়ে গিয়েছিলো।
আমার মা বাবা কে সম্পূর্ণ নতুন করে একটু একটু করে সংসার সাজানো শুরু করতে হলো। সে আরেক যুদ্ধ।
