সবকিছু ছায়াছবির মত চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভালো লাগে দূরবর্তী দৃশ্য গুলো মনে করতে। এইতো সেদিন আমরা ছিলাম গণকটুলিতে। সেদিন বলতে ১৯৭২ সাল। দেশ স্বাধীনের পর আমার বাবার পোস্টিং হয়েছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু তিনি আমাদের সহসা চট্টগ্রামে নেন নি। কারণ তখন তিনি সি আর বি তে বাসা পাননি। আর যুদ্ধের পর পর পাহাড়ের উপর ঐসকল জায়গা একটু গা ছমছমে ছিল হয়তো। তাছাড়া আমার মা অনেকদিন বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স সেকেন্ড পার্ট করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। আমরা গিয়ে উঠলাম ৩৪ এম গণকটুলী লেনে আমার দাদুর বাড়িতে। বাড়িটা আমার দাদুর সংসার ছিল এবং আক্ষরিক অর্থে তাঁর নামে কেনা ছিল। আমার দাদার নামে নয়।
গণকটুলী তে আমাদের বাসাটা খুঁজতে হলে আপনাকে যেতে হবে পিলখানা আর হাজারীবাগের মাঝামাঝি জায়গায়। গণকটুলী প্রাইমারি স্কুলের সামনে এবং মসজিদের পাশ দিয়ে দু তিন বার গলি মোচড় খেয়ে আমার দাদুর বাসার সামনে এসে থামবে। কাগজে কলমে বাড়ির মালিকানা দাদুর থাকলেও বাড়ির সামনের গেটে নামফলক ছিল মরহুম হাফিজউদ্দিন চৌধুরীর। ভেতরে একটি উঠান ছিল. সেই উঠানে একটি পাতকুয়া ছিল। এছাড়া বাথরুমের ভেতরেও একটি কুয়া ছিল। উঠানের একধারে সারি সারি নারিকেল গাছ ছিল। এবং এই নারিকেল এবং তাদের যথাযত ব্যবহার দাদুর ব্যস্ততার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল। মূলবাড়িটিতে ছিল তিনটি বড় ঘর। পাশে টানা বারিন্দা ছিল। গেটের পাশে একটি ঘর ছিল যাকে ছাপড়া ঘর বলতো। কেন জানি না। রান্নাঘরের পাশে আমাদের কুড়ানি ফুপু তার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকতেন। এই কুড়ানি ফুপুর গল্প পরে একদিন বলবো।
মহল্লার জীবন খুবই প্রাণবন্ত। সবসময় চলমান। মোড়ে কলের পাড়ে পানি সংগ্রহ করছেন কেউ বা কেউ বা গোসল সেরে ফেলছেন- লাইফবয় সাবানে ফেনা তুলে I হরদম রেডিওতে গান বাজছে I সাইকেলের দোকান, রিক্সা মেরামতের দোকান, জুতার দোকান। রিক্সার টুংটাং। বাচ্চাদের হুটোপুটি চলছেই।
সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয় ছিল বরফ ওয়ালা। রংবেরঙের বরফের নৌকা, পতাকা বা ফুল বরফ দিয়ে বানিয়ে দিবে। দাদুর কাছ থেকে পয়সা নিয়ে ছুট ছুট ছুট এদের পেছেন পেছন। আহা কি আনন্দ। আর ছিল একজন জটা বুড়ি। মানে জটা তাঁর চুলে ধরা ছিল। তিনি বয়ামে বিস্কুট এবং লজেন্স বিক্রি করতেন একটা দোকানে বসে। তাঁর প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম আমার ভয়ও লাগতো।
বাসার ভিতরেও আকর্ষণের অনেক বিষয় ছিল। দাদুর একটি পানের বাটা ছিল। খুব সম্ভবত পিতলের। কি সুন্দর খোপ খোপ। আবার ঢাকনি দেয়া।সেটা খুলে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালো লাগতো। আর ছিল দাদুর ক্যাশ বাক্স - দাদু টাকা পয়সা রাখতেন।