ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ২

January 15, 2025

আত্মীয় স্বজন আসলে আদর আপ্যায়ন করতে পছন্দ করতেন দাদু। এ ব্যাপারে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন কুড়ানি ফুপু। এই কুড়ানি ফুপুর একটু গল্প বলা যাক। রবীন্দ্রনাথে মাল্যদান গল্পের নায়িকার নাম কুড়ানি ছিল কারন তাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলো নায়কের বোন। আমাদের কুড়ানি ফুপুর নামের উৎস আমার জানা নাই। তবে তাকে এই নামেই ডাকা হত । যতটুকু গল্প শুনেছি চল্লিশের দশকের শুরুতে আমার দাদার কর্মস্থল ছিল রাজশাহী। সে সময় তার কোন এক কর্মচারী কুড়ানি ফুপুকে এনে দিয়েছিলেন। কুড়ানি ফুপুর বয়স ছিল তখন নয় দশ। সেই কর্মচারী বলেছিলেন "ভীষণ গরিব ,গাড়ওয়ান বাপ খেতে দিতে পারে না , মা নেই। আপনার কাছে রাখেন, বেগম সাহেবের টুক টাক কাজ করবে । খেয়ে ,পড়ে , ‌বেঁচে যাবে মেয়েটা" । সেই থেকে তিনি এই পরিবারের সাথে ছিলেন। দাদা রাজশাহী থেকে কলকাতা বদলি হয়ে যাবার সময় কুড়ানি ফুপুকে রেখে আসতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর বাবা বললেন- " আপনার কাছেই সে ভালো আছে।" এরপর কলকাতা থেকে ঢাকা - এই পরিবারই কুড়ানি ফুপুর নিজের পরিবার হয়ে যায়। তাঁর বাবা লেখাপড়া জানতেন না- সেই কর্মচারীর মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল যতদিন বাবা বেঁচে ছিল। এরপর তাঁর খোঁজখবর নেয়ার কেউ ছিল না। আমার মা বলেছিলেন " কুড়ানি আপা আপনার গ্রামের নাম বলেন খোঁজ নেই" কিন্তু তিনি বলতেন "আমাকে কেউ চিনবে না আমিও কাউকে চিনবো না।" আম্মার মুখে শুনেছি দাদা বাজারে যাবার সময় তিনি এটা সেটা আনতে বলতেন। " "আব্বা , ভালো দেইখ্যা লাউ আনবেন। দুধ কদু রান্ধুম।" হ্যা তিনি দাদা দাদু কে আব্বা আম্মা ডাকতেন আর নিজের দেশের ভাষা ভুলে গিয়ে ঢাকার ভাষায় কথা বলতেন। এক সাইডে সিঁথি করতেন আর চুলে আলফ্রেড কাটতেন। আলফ্রেড কাটা মানে হচ্ছে সিঁথির পাশে চুল একটু ঢেউ খেলে উঁচু হয়ে থাকবে। তাঁর বিয়ে হয়েছিল- কিন্তু ভাগ্যের টানে তিনি আবার ছেলে মেয়ে নিয়ে আমাদের গণকটুলির বাড়িতেই ফিরে এসেছিলেন। ৭০ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন গনক্টুলিতে আমার দাদির পাশের ঘরে শুয়ে।

ঠিকানা বিহীন মানুষ ভাসতে ভাসতে কোথায় চলে যায়! যেখানে যায় সেখানে একটা জায়গা ধরে রাখতে চায়। পারে কি ?

আমার আম্মাদের বাসায় সাহেরা বু ছিলেন।এই সাহেরা চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নাকি আমার মায়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে খুব ছোট বয়সে বার্মা মুলুকে ছিলেন।চল্লিশের দশকের কোনো এক সময় তাদের কে এবং তাদের মত আরো অনেককে জাহাজে উঠিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাঁর বাবা তাদের দু বোনকে নিয়ে এক জাহাজে ছিল। অন্য জাহাজে পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিল। তাঁদের বাবা জাহাজে ওলা ওঠা ( কলেরা) হয়ে মারা যায় এবং তার লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়। এই দু বোন কে তাঁদের এক চাচা মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়। প্রচন্ড ক্ষুধার তাড়নায় তার মা তাদের বেচে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সৌভাগ্যক্রমে কোঅপারেটিভে চাকুরীরত আম্মাদের এক আত্মীয়ের কাছে এসে পরে সাহেরা বু এবং তাঁর বোন এবং আমার নানার বাসায় আশ্রয় পায়।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধদের সময় মানুষের কি পরিমান ক্ষুধা ছিল ভাবা যায় - ক্ষুধার তাড়নায় সন্তান কে ঠিকানাহীন ভাবে অন্য পরিবারের কাছে দিয়ে দিতে হয়েছে।

কুড়ানি ফুপু আর সাহেরা বুর গল্প বলতে গিয়ে নিজের ছোট বেলার গল্প থেকে একটু বেরিয়ে গেলাম। সাথে থাকুন আবার আসছি শিগ্রই।

দাদুর বান্ধবীরা আসতেন। সামনের খানমজলিশ বাড়ির রেহালার মা, লিটনের মা, কাজী বাড়ির বৌ এমন অনেকে। সংসারের গল্প গুজব হতো। সাথে চলতো পান সুপারি। মাঝে মাঝে খাজে দেওয়ান থেকে আসতেন দাদুর বড় বোন আমাদের বড় দাদু আর নবাবগঞ্জ থেকে দাদুর cousin রহিমা বুজি। বোরখা পড়ে রিক্সা করে আসতেন তাঁরা। দাদু আপ্যায়নে ব্যস্ত হতেন।

চলবে