ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ১১

গাছি

March 22, 2025

গুলশানে থাকতেই আমি প্রথম গাছি দেখি এবং এই শব্দের সাথে পরিচিত হই। গুলশানে নানার বাসার ঠিক গেটের সাথেই একটা খেজুর গাছ ছিল। শীতের দিনে ভোর বেলায় একজন ভদ্রলোক আসতেন। তার কাজ ছিল ওই খেজুর গাছ কাটা এবং রসের হাড়ি ঝুলিয়ে দেয়া। আমি জানলাম এদের গাছি বলে এবং এদের পেশাই এটি।

গুলশানে ১৯৭২ থেকেই আমার নানার পরিবারটি ছিল যৌথ পরিবার। আমার নানা ছিলেন পরিবারের কর্তা। তাঁর ছেলেমেয়ে নাতি নাতনি নিয়ে এই পরিবার। আমার এক মামা মাঝে মাঝেই উষ্মা প্রকাশ করতেন " সবাই মিলে এখানে থাকার কি দরকার? ভাড়া দিলে পরিবারের অর্থনৈতিক সমবৃদ্বি হত, ইত্যাদি "। কিন্তু ওই পর্যন্তই। শেষ পর্যন্ত সবাই একসাথে থেকেছেন এবং সেটাই ছিল মজা। বস্তুত: তখন বারিধারা ছিল না। গুলশানেই সব ডিপ্লোম্যাট রা থাকতেন, অনেক দূতাবাস ও ছিল এখানে। বাড়িটা বিদেশিদের কাছে ভাড়া দেয়া যেতে পারতো হয়তো , কিন্তু সেটা আর হয় নি এবং এভাবে জড়িয়ে থাকতেই একধরণের আনন্দ ছিল।

মধ্যহ্নে বা রাতে সবাই একসাথে খেতে বসত। টেবিলের হেড চেয়ারে বসতেন নানা। আমরা সবাই বিশাল ডাইনিং টেবিলের চারপাশে বসতাম। নানু পাশে দাঁড়িয়ে তত্বাবধান করতেন। আমার বড় দুই মামী রসুইখানার দায়িত্বে ছিলেন। আমার নানার এবং আমার মতো ভাই বোনের কাঁসার থালা, বাটি এবং গ্লাস ছিল। থালা এবং গ্লাসের মধ্যে নাম খোদাই করা ছিল। এই যে আমার নানু পরিবেশনা তত্বাবধান করতেন - এটা না করলে তিনি শান্তি পেতেন না। কে লেজা পছন্দ করে বা কে মুড়ো এটি তিনি জানতেন। আবার সবাই যেন ঘুরে ঘুরে সব জিনিস খেতে পারে এটাও নিশ্চন্ত করার ব্যাপার ছিল। আমার মামাতো ভাই কানে কনে হয়তো বললো " দাদু আমাকে হাড্ডি ওয়ালা মাংস দিবেন। মা আমাকে দিবে না। " এই রকম কত আবদার ছিল তার কাছে। এই যে বাড়ির কত্রীরা পরিবেশন করবেন এবং নিজেরা সবার শেষে খাবেন এটাই ছিল চালু ধারা। এটা কোনো চাপিয়ে দেবার ব্যাপার ছিল না। বাড়ির কত্রী হিসাবে তাদের বেশ কর্তৃত্ব ছিল এবং ইচ্ছে করলেই আগে খেতে বসতে পারতেন। কিন্তু তারা কিছুতেই শান্তি পেতেন না ছেলে মেয়েদের খাবারের দেখভাল দাঁড়িয়ে থেকে করতে না পারলে। এটা ছিল তখনকার নোর্ম্। আমার মায়ের সময় আবার কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করেছি। আমার মা খাবার সাজিয়ে দিতেন , তারপর আমাদের সাথে একসাথে খেতে বসতেন। আমরা যার যার টা সে সে নিয়ে নিতাম। কেউ কাউকে বেড়ে দেবার কোনো নিয়ম ছিল না। অবশ্য ছেলে বেলায় আমার ভাইকে অনেকদিন পর্যন্ত মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন।

রোজার দিনে নানা ড্রইয়িং রুমে সবাইকে নিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়তেন। এবং ছেলে ও নাতিদের নিয়ে তারাবির নামাজ পড়তে যেতেন গুলশান জামে মসজিদে। নানা ওই মসজিদের কমিটিতে ছিলেন বহু বছর। রমজান মাসে দুপুরের দিকে দেখতাম মামী রা এবং নানু কোরান শরীফ পড়ছেন। রমজানে এক খতম দিতে হবে এই ছিল নিয়ত।

ড্রয়ইং রুমে টিভি ছিল। সেখানে সবাই মিলে বসে টিভি দেখা হত। আমাদের বাচ্চাদের জন্য শর্ত ছিল পড়াশুনা শেষ করে আসতে হবে। ইংরেজি ছবি দেখানো হত আটটার খবরের পরে। The Saint এর কথা মনে আছে। আরো মনে আছে ৭২ ৭৩ সালে কিছু ভারতীয় চলচিত্র দেখানো হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের তিন কন্যা, অপরাজিত , পথের পাঁচালি , সীমাবদ্ধ সব যে বুঝতাম তা না। কিন্তু বাড়ির সবাই বসত তাই সবার সাথে একসাথে দেখতে বসতাম। আমার নানা এই সব অনুষ্ঠান সব দেখতেন এবং আলোচনায় অংশ নিতেন।

ইংরেজি খবর পড়তেন ফারহানা হক। তিনি সুদর্শনা এবং সপ্রতিভ ছিলেন। খবর শেষে তিনি একটি মিষ্টি হাসি দিতেন। সেই হাসি অনেকের মন কেড়ে নিয়েছিল।এর পরে ফারহানা নামটির আধিক্য লক্ষ করা গেছে।

ফারহানা হক এর এখনকার অবস্থান জানালাম নিচের কমেন্টে।

এই ছিল আমাদের শান্ত শিষ্ট মিষ্টি নিরুদ্বিগ্ন জীবন। কিন্তু জীবন তো এখানে থেমে থাকে নি , তাই না ?

এই ছবিতে আমি নেই। আছে আমার দুই মামাতো ভাই মাহফুজুল আজিজ সাদি , মুস্তাফিজুল আজিজ জমি , মামাতো বোন ফারজানা ওবায়েদ উর্মি , ফারহানা ওবায়েদ শর্মী, খালাতো ভাই ইশতিয়াক হোসেইন সানি এবং আমার ভাই মহিবুল আমানুল শুভ।