ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ১২

জাসদ , বিচিত্রা , মার্সিডিজ আর সার্টিফিকেট

March 24, 2025

আসলে আমি আমার আমিকে চিনতে চাই। তাই এসব লিখছি। আমার আমি কে চিনতে আমার ছোটবেলার দিনগুলি জানা দরকার। কারণ সেটাই হচ্ছে গোড়া।

৭৩ ৭৪ এ আমাদের আশেপাশে জাসদ, বিচিত্রা এসব শব্দ ঘুরতো। আজকালকার polarization যুগে কোনো দলের কথা বলতে ভয় পাই। কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে সহজেই মানুষ মানুষ কে লেভেল করে। যাই হোক আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলছি যে আমি অনেক ছোটবেলায় জাসদের সাথে পরিচিত হয়েছি বলেই যে আমি ওই দল করতাম বা ও দলের সাথে আমাদের পরিবারের সবাই যুক্ত ছিলাম তা কিন্তু নয়।

তবে এটা ঠিক যে শিশুদের আসে পাশে যে শব্দ ঘোরাফেরা করে তার অনেক কিছুই শিশুরা মনে রাখতে পারে। যাই হোক, ৭৩ /৭৪ এ জাসদ একটি আলোচিত শব্দ ছিল। তাছাড়াও আমার এক মামা জাসদ করতেন বলে এই শব্দের সাথে আমার আরেকটু বেশি পরিচয় ঘটে। আমার টুলু মামা ( মাঝহারুল হক টুলু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এর আগে তিনি ছয় দফা ও ১১ দফা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনের পর তিনি জাসদ সগঠনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৩ সালের মে মাসে জাসদের দফতর সম্পাদক এবং জাসদের মুখপত্র দৈনিক গনকন্ঠের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। টুলু মামার সাথে জাসদের অনেকেই আমাদের বাসায় এসেছেন। এখানে মনে রাখা দরকার যে আমার নানা বাড়ির মধ্যে সব রকমের মানুষ ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন পার্টি র পক্ষে বিপক্ষে আবার ভাসানী ন্যাপের পক্ষে এরকম অনেক। (আমার মিলু মামা ভাসানি ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলেন।) এখানে যে জিনিসটা লক্ষণীয় যে একটা সহিষ্ণুতা ছিল। এক ভাই জাসদের সাথে যুক্ত ছিল বলে আরেক ভাই মারদাঙ্গা হয়ে উঠবে , ব্যাপারটা সেরকম ছিল না। আমার নানা ছিলেন সিভিক সেন্স আর পারফেক্ট জেন্টলম্যান যুগের মানুষ। তিনি ছিলেন লিবারেল মাইন্ডের লোক। এই সব জাসদের ছেলে মেয়েরা আসলে তিনি কিছু বলতেন না। বরং তিনি তাদের সাথে কথা বার্তা বলতেন এবং বুঝতে চাইতেন তাদের বক্তব্য। আমার দাদার বাসায় আবার অন্য তরিকা। আমার বাবা বলতেন "আমরা প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের সাথে এতো সংগ্রাম করেছি যে আমাদের দেশোদ্ধারের কাজে নামার সুজুগ ছিল না। "যাই হোক জাসদ, গণকণ্ঠের আলোচনা ছিল এবং এটা সে সময়ের একটা রাজনৈতিক ইতিহাস বটে যে অনেক তরুণ জাসদে যুক্ত হয়েছিল।

আরেকটা ব্যাপার ছিল বিচিত্রা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন । বিচিত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ এ.. ১৯৭৩ এ বাসায় নিয়মিত বিচিত্র রাখা হাত। এটা যদি ও তখন আমার পড়ার বয়স হয় নি কিন্তু বড়দের হাতে দেখেছি।পরবর্তীতে যারা বিচিত্র পড়েছেন বা দেখেছেন তারা জানেন এর uniqueness । পাঠকের পাতা পাতা, প্রবাস থেকে, এখানে সেখানে, জীবন যেখানে যেমন , ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন- কি চমৎকার সব আয়োজন।

আমাদের বাসায় নানার সাথে দেখা করতে আত্মীয় স্বজন আসতেন। নানার কাজিন তাতু নানা আসতেন তার মার্সিডিজ গাড়ি নিয়ে। এরকম আরো অনেকে আসতেন। তখন আত্মীয়তা এবং অতিথি পরায়ণতা সামাজিক জীবনের অংশ ছিল।

আমি চিন্তা করি আমি আমার ছোটবেলায় নানা রকম মানুষ, নানা রকম জীবন দেখেছি তবু এখনো ভালো করে নাম করা মডেলের গাড়ি চিনি না। জাসদের যারা এ বাসায় আসতেন ( নাম বললে চিনবেন) তারাও অনেক কিছু করেছেন বা হয়েছেন কিন্তু আমার কি সেই ঝোলাওয়ালা পাঞ্জাবি, পায়জামা পড়া তরুণ প্রজন্মের কথাই বেশি মনে আহে ? জানি না।

নানা বাড়ির এতো কথা বললাম নানার কথা বলা দরকার আমার নানা ১৯৭১ সালে দিনাজপুরে জয়েন্ট ডিসি ( রেভেনিউ ) ছিলেন। এই সময় তিনি দিনাজপুরের ডিসি ফয়েজ আহমেদ (CSP) এর সাথে দেশ ত্যাগ করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে যোগদান করেন । অনেক ই হয় তো জানেন না যে সামরিক জোনের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার নির্বাহী কাজ চালাতে প্রশাসনিক জোন করেছিলেন। আমার নানা সেই রকম একটি জোনের ( মালদহ ) জোনাল এডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন। ( Ref ). যখন একে একে অঞ্চল গুলো মুক্ত হচ্ছিলো তখন এই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। আমার নানা ২১ শে ডিসেম্বর স্বাধীন রাজশাহীর প্রথম ডিসি বা জেলা প্রশাসক হিসাবে যোগদান করেন। সংযুতঃ রেফ ডকুমেন্ট এ নানার নাম জেড আই ভূঁইয়া কাছে) আমার নানা মুক্তিযুদ্ধার সার্টিফিকেট নেন নি। এবং পরিবারের কেউ কোনো সুযোগ সুবিধা নেন নি। আজব না? আমি ও খুব আজব। কোনো কিছু কখনো জাহির করতে পারি না। আর যখন দেখি ঠকে যাচ্ছি তখন রেগে মেগে চটাং চটাং কথা বলি। কি এক টা অবস্থা।

ছায়াছবি ১২