ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ১৩

শাহীন স্কুল, কলম তারা আর টিমোথি বুন

March 29, 2025

(ছবি সংযুক্ত করেছি আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু শুধু ছবি দেখবেন আর গল্পটি পড়বেন না, তা কিন্তু হবে না। )

১৯৭৩ সালে আমাকে শাহীন স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। আমি , আমার মামাতো ভাই সাদি আর মামাতো বোন উর্মি ভর্তি হলাম। উর্মি খুব ছোট্ট ছিল। তাকে শিশু শ্রেণীতে ভর্তি করা হলো। আমার শিশু মনে শাহীন স্কুল কে বিশাল মনে হত। অনেক বড় বড় মাঠ ছিল। সকালে গেলে দেখতে পেতাম বিমান বাহিনীর লোকেরা সেখানে হকি খেলা প্র্যাক্টিস করছে।

আমাদের জন্য একটি মাসকাবারি রিকশা ঠিক করা হয়েছিল। রিক্সাওয়ালার নাম কলম তারা। কলমতারা আমাদের সকালে গুলশান ১২৮ নম্বর রোডের বাসা থেকে নিয়ে যেতেন আবার পৌঁছে দিতেন।এরকম ব্যবস্থা আরো কয়েকজনের ছিল। আজকের দিনে ব্যাপারটা অবিশাস্য মনে হতে পারে। গুলশান থেকে শাহীন স্কুল রিক্সায় ? তাও আবার তিনটি শিশু একা ? কলমতারা সাহেব খুবই নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন। এখন দেখি কিছু ভ্যানের মতো গাড়িতে করে বাচ্চাদের স্কুলে আনা নেয়া করা হয়। তো কলমতারার রিক্সায় আমরা আসা যাওয়া করতাম , ভ্যানের বদলে এই আরকি। এই ব্যবস্থা খুবই স্বল্প সময়ের জন্য ছিল। এরপর আমার নানা একটি ফিয়াট গাড়ি কিনেন।এবং তারপর থেকে আমরা সেই গাড়িতে করেই আসা যাওয়া করতাম। আহ আমাদের সেই জলপাই রঙের ফিয়াট !

আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন ফিরোজা ওমর। তাঁর শিশুদের মনে ছাপ ফেলার একটা ক্ষমতা ছিল। আজ ৫০ /৫১ বছর পরেও তাঁর নাম আমার মনে আছে। স্কুলটি কোএডুকেশন ছিল। ক্লাসের একদিকে ছেলেরা আরেকদিকে মেয়েরা বসত। আমাদের সাথে নায়ক রাজ্জাকের ছেলে রেজাউল করিম ( বাপ্পা রাজ্) পড়তো। স্কুলটিতে সপ্তাহে একদিন কুচকাওয়াজ হতো। ছাত্র ছাত্রীরা ঈসা খান, নজরুল, শেরে বাংলা আর তিতুমীর এই চার দলে ভাগ হয়ে ব্যান্ডের তালে তালে মার্চ করতো। আমার ড্রামের আওয়াজ ভালো লাগতো। মনে হত যেন আমি এক সেনানী, বীর দর্পে এগিয়ে যাচ্ছি।

এই সময় আমি আনন্দের সাথে পড়াশুনা করতাম। আমার উপর কোনো চাপ ছিল না। আমি নানা বাড়িতে ছিলাম। আম্মা তখন মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। কাজেই আমি আমার মত ছিলাম। বড় মামী মামাতো ভাই সাদিকে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় পড়াতে বসতেন। আমিও গুছিয়ে গাছিয়ে একটি চেয়ার নিয়ে পাশে বসতাম আর প্রতিদিনের পড়া করতাম। ইংরেজি, বিজ্ঞান,পৌর নীতি ,ইতিহাস সব বিষুতেই আমি মজা পেতাম। কোনো কম্পেটেটিভ মনোভাব ছিল না। প্রতিযোগিতা মূলক ভাবটা এসেছে পরে। সেটা পরে বলবো।আমাদের ইতিহাস অথবা অন্য কোনো একটা বইতে কবিরের ( সাধক) এবং চৈতন্য দেবের গল্প ছিল।

আমাদের গানের ক্লাস , নাচের ক্লাস ছিল। গানের শিক্ষক ছিলেন ওস্তাদ ফজলুল হক। ছোটবেলায় সব বিষয়ে উৎসাহ ছিল। আমি প্রথমে নাচের ক্লাসে নাম লিখলাম। তারপর সেখানে সুবিধা করতে না পেরে গানের ক্লাসে চলে গেলাম। একটি গান শেখানোর চেষ্টা হত " বাগিচায় বুলবুলি তুই -" গানটি কঠিন। কিন্তু কেন যে এটা শেখানো হত কে জানে ? আমাদের সাথে একটি মেয়ে পড়তো শাহানাজ রুমানা শম্পা। সে খুব মিষ্টি দেখতে ছিল আর তখনি সে রেডিও টেলিভিশনে ছোটদের অনুষ্ঠানে গান গাইতো। আরেকটি মেয়ে মাহবুবা পান্না। সে আশ্চর্য জনক ভাবে আমাকে মনে রেখেছে। বহু বছর পর তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। সে এখন অতিরিক্ত সচিব।

আমার ঝোঁকে চলার ব্যাপারটা জন্মগত। আমি মাঝে মাঝে এমন সব কান্ড করতাম যে ফিরোজা ওমর কখনো রাগ করতেন আবার কখনো হেসে ফেলতেন। আমাদের স্কুলে টিফিন দিতো। গজা , নিমকি, কলা, প্যাটিস। আমি এগুলো বক্সে করে ভাইয়ের জন্য নিয়ে আসতাম। আবার কখনো কখনো বাক্স খুলে টুক করে একটু ভেঙে খেয়ে ফেলতাম। মানে ভাইয়ের জন্য নেবার ও ইচ্ছা আবার খাবার ও ইচ্ছা। এই ব্যাপারটি আমার পাশে বসা ফরিদা ফিরোজা ম্যাডাম কে বলে দিলো। কেন বললো কে জানে। তিনি হেসে ফেললেন - তারপর সবার উদ্দেশ্যে বললেন এই শোনো টিফিন কিন্তু তোমাদের জন্য দেয়া হয়। বাসায় নিয়ে যেও না। যদিও উনি আমাকে কিছু বলেন নি তবু ও আমার লজ্জা লাগলো।

ওই যে বললাম আমার সব ব্যাপারে উৎসাহ ছিল। স্কুলে সাংস্কৃতিক সপ্তাহ শুরু হলো। আমি ইংরেজি এবং বাংলা কবিতা আবৃতিতে নাম দিয়েছিলাম। বাংলা কবিতা শিখলাম লিচু চোর আর ইংরেজি কবিতা শিখলাম টিমোথি বুন। এগুলো স্কুল থেকেই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। কোনো পুরুষ্কার পাই নি, কিন্তু উৎসাহের সাথে পার্টিসিপেট করেছিলাম।