আজকের পর্ব দিয়েই আশা করছি আমাদের গুলশান নানা বাড়ি পর্ব শেষ হবে। আগেই বলেছি এই সময় আব্বু জার্মানিতে ছিলেন। নানাবাড়ি তে বেশ আনন্দময় সময় ছিল। আম্মা এই সময় মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেন। আম্মার ঢাকা ইউনিভার্সিটি এর গল্প দুই পর্বের ছিল I এক পর্ব যখন আম্মার অরিজিনাল ব্যাচ ১৯৬৪/৬৫ সালের আরেক পর্ব আম্মা যখন break দিয়ে আবার মাস্টার্স করেন ১৯৭৩ সালে। আম্মা তার শিক্ষকদের অনেক গল্প করতেন। দ্বিতীয় বার ব্যাচ মেট দের মধ্যে দিলশাদ খানম এর গল্প করেছিলেন। সুরাইয়া খানমের ছোট বোন দিলশাদ খানম টিভিতে অভিনয় করেছেন - উল্লেখযোগ্য নাটক রক্ত করবী ও নয়ন সুমুখে তুমি নাই।
আমার মা বরাবরই সৌখিন এবং রুচিশীল ছিলেন। আমার পিতার সীমিত আয়ে এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে অনেক কিছুই করা যেতোনা। কিন্তু আম্মা সঞ্চয় করে টুক টুক করে এটা সেটা শখ পূরণ করতেন। আমরা নানার বাসায় ছিলাম। তো আম্মা মাঝে মাঝে নাস্তার আয়োজনের জন্য গুলশান ১ নম্বর থেকে এটা সেটা আনতেন। এর মধ্যে ছিল ছোট গোল সিলভার রঙের বক্সে চিকেন সালাদ বা tuna সালাদ। এগুলো দিয়ে স্যান্ডউইচ বানানো হত। বিশ্বাস করছেন কিনা জানি না তখন গুলশান ১ নম্বরে দু একটা দোকানে এগুলো পাওয়া যেত। বিদেশিদের যে জন্য এনে রাখা হত। আম্মা সবসময়েই নানা রকম নতুন খাবার তৈরির চেষ্টা করতেন। আমি ট্যালা মানুষ। আম্মার কোনো গুণ পাই নি। লোকজন কত নতুন নতুন খাবারের নাম বলে আমি হ্যা করে তাকিয়ে থাকি। যাই হোক খাবারের প্রসঙ্গে একটা মজার কথা মনে হলো। আমার মামীরা মিট সেফে রাতের জন্য মুরগি বা অন্য মাংস রান্না করে রেখে দিতেন। নির্জন দুপুরে আমি টুক করে তুলে এক পিস্ খেয়ে নিতাম। চিন্তা করেছেন অবস্থা ! এই রকম আরো অনেক কিছু করে আমি আম্মাকে বেকায়দা অবস্থায় ফেলে দিতাম। তবে আমার এখনো আশ্চর্য লাগে যে আমার নানা বাড়িতে খাবারের ব্যাপারটা ম্যানেজ হত কিভাবে ? বাসায় এতগুলো লোক- তার উপর প্রায়ই বন্ধু বান্ধব , আত্মীয় স্বজন যুক্ত হত। বিশেষ করে টুলু মামার জাসদ গং হুট হাট চলে আসতো। অনেকেই আসতো রব, জলিল, শাজাহান সিরাজ, মার্শাল মনি আরো কি কি নাম। আমার নানার মত ওপেন ডোর পলিসি আলা লোক খুব কম দেখেছি। এই সময় আরো আসতেন নার্গিস খালাম্মা ও মুর্তজা মামা। মুর্তজা মামা ( জোবাইদুর রহমান ) পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ছিলেন এবং আরো পরে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক (Washington) এ কাজ করতেন।
আম্মার শখের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আম্মা আমাকে এত অভাবের সময়েও কারিকা ( see comment) থেকে ঈদে জামা কিনে দিয়েছিলেন। এবং শুভকে এলিফ্যান্ট রোডের সাত রং বলে একটি দোকান থেকে খুব সুন্দর একটি শার্ট কিনে দিয়েছিলেন। এগুলো ছিল ঈদের জামা। আম্মা জুতা কিনতেন সাকুরার নিচ তলার দীপালি সুজ থেকে। এই দীপালি সুজ আম্মার খুব পছন্দের। সব সময় এখন থেকেই কিনবেন। পরে আমার চট্টগ্রাম থেকে এসে এখন থেকে জুতা কিনতাম। পরে অবশ্য এই দোকান খুব সম্ভবত উঠে যায়।
আম্মার একটা কষ্টের গল্প বলি। আম্মা একবার খুব শখ করে টাকা পয়সা জমিয়ে দীপালি সুজ থেকে এক জোড়া জুতা কিনেছিলেন। পরে আমাদের এক আত্মীয়ার জুতা না থাকতে আব্বু আম্মাকে ওই জুতা জোড়া দিয়ে দিতে বললেন। বললেন " তুমি তো আরো কিনতে পারবে। ' আম্মা এটা কখনো বলনে নি। কিন্তু তার মনে ছিল। যখন পাল্টা অভিযুক্ত হতেন পরিবার থেকে তখন কষ্টে বেরিয়ে যেত। আমরা আজকালকার মেয়েরা " কত টুকু অশ্রু ফেলেছি যে ভালোবাসবো?"
রান্না প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি ৭২ এর শেষে যখন আমরা গুলশানে থাকা শুরু করি তখনি আমরা গ্যাসের লাইন পাই। যারা সন্দিহান তারা তিতাস গ্যাসের খনন ইতিহাস দেখতে পারেন। ১৯৬২ খনন শুরু এবং ১৯৬৮ প্রোডাকশন শুরু। এটাও ভাবা দরকার গ্যাসের অপচয় কিভাবে রোধ করবো।
আমরা ১৯৬৯ থেকে গুলশানে আছি। তবু উচ্চবিত্ত হতে পারি নি। আমরা মধ্যবিত্ত। আমরা মধ্যবিত্তের মত রাজনৈতিক আলোচনা করি, ইতিহাস সংস্কৃতি আর ধর্ম চর্চা করি। কিন্তু একই অবস্থানে থেকে যাই। সম্পদ আহরণ করতে পারিনা। আর আমি তো সবসময়েই ইনপুটের চেয়ে আউটপুট কম দেয়া মানুষ। যে ইনপুট আমি পেয়েছি সে তুলনায় কিছুই হতেও পারিনি , দিতেও পারিনি।
তবু আলহামদুল্লিল্লাহ ! নানা খাবার শেষ করার পর সবসময় বলতেন আলহামদুলিল্লাহ!
