১৯৭৪ এর শেষের দিকে আব্বু জার্মানি থেকে ফিরে আসলেন। আপাততঃ আমাদের ঢাকা বাসের সমাপ্তি হলো। আমরা চট্টগ্রামে চলে আসলাম। শুরু হলো পাঁচ বছরের জন্য আমার সি আর বি জীবন। এই সময়টির গুরুত্ব আমার জীবনে অসীম। সি আর বি এর প্রকৃতি আমাকে মোহাবিষ্ট করতো। আমি যে ঘরে পড়তাম সেটার জানালা দিয়ে খানিকটা দূরের পাহাড়ের চকচকে সরু রাস্তা দেখা যেত। তার দুপাশে বিশাল বিশাল গাছ। আমাদের বাসাটাও একটা টিলার উপর ছিল। এ পাহাড় আর ও পাহাড়ের মাঝ খানে বেশ গভীর খাদ ছিল। জানালা দিয়ে সেই চকককে রাস্তা আর গাছদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। যেন এক রূপকথার দেশের পথ দেখা যাচ্ছে। আমি যখন সেই রাস্তা দিয়ে হাটতাম আমার মনে হতো সেই বিশাল গাছেরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে সেই মায়াবী আলিঙ্গন অনুভব করি। কিন্তু এই গল্প শুধু গাছদের নয়। আরো গল্প আছে।
শুধু আমি নই। সেসময় যারা এই ধরণের সরকারি পাড়া বা সরকারি চাকুরী সূত্রে একই পাড়ায় ছিলেন তারা সকলেই সেই জীবনের গল্প বলতে পারবেন। সে এক অন্য জীবন। আত্মীয় নয়, কিন্তু একপর্যায়ে আত্মীয়ের চেয়ে বেশি। এখনো পর্যন্ত সেই বন্ধন রয়ে গেছে। আমাদের বাবা মায়েদের চাকুরী , শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সামাজিক আচার আচরণ একই রকম ছিল। আহা আমাদের সেই জীবন। আমরা- আমি, সোমা,শায়লা, দিশা, বুশরা আর আমাদের শৈশব, কৈশোর।
যারা সি আর বি কথাটার মানে বুঝতে না পেরে একটু বিরক্ত হচ্ছেন, তাদের জন্য - সি আর বি - সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং এর সংক্ষিপ্ত রূপ। , এই বিল্ডিং টির আসে পাশে বা কাছাকাছি যে বাড়ি গুলো সেগুলো নিয়েই এই সি আর বি পাড়া। ১৯৭৪ এর ডিসেম্বর এ যখন আমরা প্রথম চট্টগ্রাম আসি , তখন বাসা পাই নি। তখন আমরা ছিলাম রেলওয়ে রেস্ট হাউস এ। এটি বর্তমান রেস্ট হাউসটি না। এখন যেখানে জেনারেল ম্যানেজারের বাংলো সেটিই ছিল রেস্ট হাউস। সেখানে দুটি রুমে আমরা ছিলাম। এটাই নিয়ম ছিল। বাসা পাবার আগে রেস্ট হাউসে থাকতে হত।
আমাকে স্কুলে ভর্তি করানোর প্রস্তুতি চলছিল। কোন স্কুলে ভর্তি করানো হবে খাস্তগীর না স্কলাস্টিকা তাই নিয়ে চিন্তা ভাবনা চলছিল। আমার বিদ্যানুরাগী বাবা আমাকে নিয়ে নিয়মিত পাড়াতে বসছিলেন যাতে আমি ভর্তি পরীক্ষায় উৎরে যাই। আমি স্কলাস্টিকায় ভর্তি পরীক্ষা দিলাম এবং বেশ ভালো করলাম। আমার বাবা খুশি মনে আমাকে ভর্তি করে দিলেন। আমার বাবা সেন্ট গ্রেগোরির ছাত্র ছিলেন তাঁর আজীবন মিশনারি স্কুলের প্রতি ঝোঁক ছিল। এই স্কুল , এখানকার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং বন্ধুরা আমার জীবনে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। চলুন আগামীতে আমার সি আর বি জীবন আর আমার স্কুল জীবনের সেই গল্প শুনি।
