আমি একটু weird ছিলাম কি ? মানে সচরাচর বাচ্চারা যা করে না তাই করতাম কি ? জানি না। তবে আমার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের কথা মনে আছে। চতুর্থ শ্রেণীতে আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন রানী টিচার তিনি আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। আমি কিন্তু শান্তশিষ্ট ছিলাম না। ওই যে বললাম একটু উল্টাপাল্টা ছিলাম। কাজে কাজেই আমাকে পছন্দ করা খুব সহজ ছিল না। যাই হোক, একবার টিচার ঘোষণা দিলেন যে লং উইকেন্ড আসছে তারপর স্কুল যেদিন প্রথম খুলবে সেদিনই একটি ক্লাস টেস্ট নেয়া হবে। এদিকে সেই লং উইকএন্ডের সাথে একদিন বেশি নিয়ে আমার আব্বা আম্মা ঢাকায় যাওয়ার প্ল্যান করছিলেন।ঐদিনই টেস্ট হবার কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেলো। তখন সদ্য ঢাকা থেকে এসেছি , ঢাকা যাওয়ার আকর্ষণ ছিল আলাদা। আমি টিচারের কাছে গিয়ে বললাম " টিচার যেদিন টেস্ট হবে ঐদিন আমরা ঢাকা যাবো। " মানে বলতে চাইলাম যে ঐদিন টেস্ট নিয়েন না I টিচার অবাক হয়ে বললেন " তুমি অবান্তর কথা বলছো। তোমার ঢাকা যাওয়ার সাথে টেস্ট এর কি সম্পর্ক?" বাসায় এসে আম্মাকে জিঞ্যেস করলাম "আম্মা অবান্তর মানে কি?"
আমার একধরণের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। আমি এই স্কুলে একটি কবিতা আবৃতি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে দিলাম। কবিতাটি ছিল রবি ঠাকুরের " বীর পুরুষ" I এবার আমি পুরস্কার পেয়েও গেলাম। এছাড়া আমি নিজে নিজে অনেক কিছু করতাম। যেমন "ষোলো আনাই মিছে" কবিতাটি আমার এক বান্ধবী কে নিয়ে অভিনয় করে ক্লাসে দেখালাম । পরবর্তীতে বড় হয়ে আমার এই স্বতঃস্ফূর্ততা সময় সময় নষ্ট হয়ে যেত। আমার ইনহিবিশন চলে এসেছিলো। নিজেকে প্রমান করার ভয় চলে এসেছিলো। আমি এখন ভাবি শিশুদের সব দিক কি পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় ? বাধাটা কোথায় থাকে ?
এর মধ্যে স্কুলে 'ইয়েলো বার্ড ' এলো। ইয়েলো বার্ড গার্লস গাইড এর বাচ্চা শাখা। আমি নাম দিয়ে দিলাম।এখানে বেশ কিছু কার্যক্রম করানো হয়েছিল। গান করেছিলাম " রও রও রও ইওর বোট , জেন্টলি জেন্টলি ডাউন ". এসময় বেশ ইন্টারঅ্যাকশন হলো মেলিসা আন গ্রেগোরির সাথে।আমাদের সহপাঠী ছিল I কি কারণে যেন আমাদের সালাদ বানাতে এবং সাজাতে হয়েছিল । সে এমন সুন্দর করে সালাদ সাজালো যা কিনা আমি তখন পর্যন্ত কোথাও দেখিনি। মেলিসা গ্রেগরি , সুসান মার্সার, সান্ড্রা মার্সার ওরা সবাই এখন কানাডা থাকে। আমার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ আছে। শুধু একটি মেয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে লড়না ফোর্ড (Lorna Ford) ছিলেন। আমি একবার আমার সহপাঠী মার্সার বোনদের বলেছিলাম "আচ্ছা তোমাদের পারিবারিক ভাষা যে ইংরেজি তাহলে তোমরা ইংরেজিতে সবচেয়ে ভালো মার্ক পাও না কেন ?" তখন তারা আমাকে বললো আচ্ছা এখানে তো সবার পারিবারিক ভাষা বাংলা , তাবলে সবাই কি বাংলায় ভালো মার্ক পায় বা পাশ করে ? আমি পুরা ধরা।
সি আর বি তে ছোটদের জন্য ছিল "পূবালী ক্লাব"। সেই ক্লাবের বা রেলওয়ে ক্লাবের যে কোনো অনুষ্ঠানে আমি কবিতা আবৃত্তি করতাম। আমাকে কেউ কবিতা আবৃত্তি শেখায় নি। আমি নিজে নিজে কবিতা পড়ে যা বুঝতাম সেটা নিয়েই আবৃত্তি করতাম। একবার আমি "নারী" কবিতাটি আবৃত্তি রিহার্স করছিলাম যখন রুবা আপা ( ডাঃ রুবাব ফেরদৌস- আসজাদ আলী চাচার কন্যা) বললেন তুমি যে ছন্দে কবিতাটি পড়ছো এটা কিন্তু সেভাবে পড়ার নয়। আমি বুঝতে পারলাম কবিতা পড়ার একটা নিয়ম আছে। আল্লাহ রুবা আপাকে বেহেশত নসিব করুন।
আমাদের ছোটবেলায় সবাইকে একটা করে হারমোনিয়াম কিনে দেয়া হত এবং গান শেখানোর একটা ব্যবস্থা হত। আমাকেও দেয়া হয়েছিল। শাশ্বত বলে একটি গান ও নাচের স্কুল ছিল রেলওয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হোম এ। সেখান থেকে একজন শিক্ষক আসতেন আমাকে গান শিখাতে। তিন বছর শিখেও আমার তেমন কোনো অগ্রগতি হয় নি। আমি স্বরলিপি দেখে গান বাজাতে ও গাইতে পারতাম কিন্তু সুর ও তাল তেমন লাগতো না। আমাকে সবাই বলতো আমি রেওয়াজ করি না। আসলে আমার মনে হয় আমার গলায় সুর ই নেই।
আমি সব সময় তাই একটু করে বেসুরো।