এই সিরিজের নাম ছায়াছবি দিলাম কেন ? মনে এলো তাই দিলাম।আসলে আজকাল চোখের সামনে পুরানো দিনগুলো দেখতে পাই। মনে হয় যেন পুরোনো কোনো ছায়াছবি দেখছি। কি জানি মস্তিস্ক বিজ্ঞানীরা একে কি বলবেন? তবে আমার মনে হলো যা যা মনে পরে লিখে রাখি। তাই এই ছায়াছবি পর্বের অবতারণা।
৭৩ /৭৪ সালে আমরা গুলশানে আমার নানার বাড়িতে ছিলাম । সে এক মজার এবং আনন্দপূর্ণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার আগে গণকটুলী এবং আনুষঙ্গিক পর্বের "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ" খুঁটিনাটি বলতে ইচ্ছে করছে। গণকটুলিতে আমরা আর কখনো থাকিনি। দাদুকে দেখতে যেতাম, চলে আসতাম- এইরকম আরকি। কিন্তু ওই মহল্লার প্রতি একটি বিশেষ টান অনুভব করি। গণকটুলী প্রতিবেশীদের মধ্যে ছিলেন মানিকগঞ্জের, বিক্রমপুরের, খানমজলিশ , কাজী বাড়ি ইত্যাদি। পাশাপাশি ছিলেন ঢাকাইয়া কুট্টি কমিউনিটি । লিনা ( নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, আত্মীয় নয় প্রতিবেশী ) ফুপিদের পরিবার ছিল। শুনেছি ৭৩ সালের দিকে এলাকার পাতি মাস্তান তাঁকে উত্যক্ত করতো। লোকে বলাবলি করতো স্বাধীনতা উত্তরকালে এমন পাতি মাস্তানের উপদ্রব বেড়ে ছিল। এখন জীবনের প্রায় তিন কুড়ি পেরিয়ে জেনেছি যেখানে ক্ষমতা আছে পাতি মাস্তান থাকবেই। সব আমলে সব দেশে।তাই তাকে তাঁর ভাইয়ের কাছে কানাডায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এমন সব টুকরা টাকরা ঘটনা মহল্লায় ঘটতেই থাকত ।
৭২ এর শেষার্ধে কোনো একসময় আমরা চট্টগ্রাম গিয়ে বাটালি হিলের বাসায় উঠেছিলাম। বাটালি হিলের বাসা বলতে বোঝায় চট্টগ্রামের বাটালি হিলের কোলে রেলওয়ের চারটি ফ্লাট ছিল। এর একটি আব্বার নাম allot হয়েছিল। আমরা সেখানে খুব অল্প সময়ের জন্য গিয়েছিলাম। বেশিদিন থাকিনি কারণ আমার বাবার জার্মানিতে একটি প্রশিক্ষণের সুযোগ হয়েছিল। এবং আমরা ঢাকায় চলে এসেছিলাম। বাটালি হিলে অল্প কিছুদিন থাকলেও কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি আছে। বিশেষ করে এ বাড়িটি যে পাহাড়ঘেরা ছিল এই ব্যাপারটি খুব ভালো লাগতো।
আমার মনে আছে এই বাসায় কিছু বেতের সোফা এবং একটি কাঠের আলমারি ছিল। সোনা যায় সেগুলো কোনো অবাঙালি অফিসারের ছিল। এগুলো নিয়ে কি করা যায়. রেলওয়ে স্টোরে জমা দেয়া হবে নাকি কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে দেয়া হবে এই নিয়ে আলোচনা ছিল। আরেকটি গল্প আমি শুনেছি। আমাদের যেহেতু সবকিছু লুট হয়ে গিয়েছিলো তাই আমার আব্বাকে একটি গোডাউনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে জব্দ করা লুটের মাল রাখা হয়েছিল। সেখানে আমার আব্বা দেখলেন অনেক সেলায়ের মেশিন রাখা আছে। কিন্তু আমার আব্বা আমাদেরটা চিনতে পারলেন না। সাথের লোকটি বললো "তাতে কি স্যার, আপনার টা তো হারিয়েছে, একটা নিলেই তো হলো। " আব্বা দ্বিধান্বিত হয়ে চলে এলেন। এ গল্প বললাম গতানুগতিক এ কথা বলতে না যে দেখেন আমার বাবা কত সৎ ছিলেন। বরং আমার মনে সব সময় এই চিন্তা আসে যে নৈতিকতা কি যুগে যুগে বদলায় ? নাকি নৈতিকতা যে যে রকম ব্যাখ্যা করেন তেমন ? যেমন আমার জিনিস হারিয়েছে আমি তার বদলে আরেকটি নিতে পারি সেটা একেবারে আমারটি নাই বা হলো ? অথবা না আমারটা না পেলে আমি অন্যেরটা নেবো কেন? একজন কি একেক ভাবে নৈতিকতা কে দেখেন ?
খুব সম্ভবতো ৭৩ এর শুরুর দিকে আব্বা কলকাতায় গিয়েছিলেন। সাথে আম্মাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। নানার বাসার উপর দিয়ে যখন বিমান উড়ে গেলো আমার এক কাজিন বললো যে সে দেখতে পেয়েছে বিমানের জানালা দিয়ে বড় ফুপুর আঁচল উড়তে। শিশু মনের কল্পনা। আজো আকাশে বিমান উড়লে আমার সেই কথা মনে পড়ে, আমরা তিন চারটি শিশু হাঁ করে বিমানের জানালে দিয়ে উড়ে যাওয়া আঁচল খুঁজছি।
আব্বা কলকাতা থেকে আমার জন্য অনেক বই এনেছিলেন। আমার পিতা আমাদের পড়াশুনার জন্য কি না করেছেন। এর মধ্যে সুকুমার রায়ের একটি সংকলন ছিল নাম ভুলে গেছি। কিন্তু দুটো গল্প মনে আছে। একটি দ্রিঘাংচু আরেকটি হিংসুটি। আরো ছিল টারজানের ১২টি সিরিজ এবং ছোটদের বুক অব নলেজ। দ্রিঘাংচু গল্পটি পড়েছেন ? কি চমৎকার করে সুকুমার রায় ক্ষমতাবান ও তাঁদের পারিষদবর্গের বোকা বোকা কান্ড কারখানা তুলে ধরেছেন। ছোটদের বুক অব নলেজ ছিল দেব সাহিত্য কুটিরের প্রকাশনা। এটি তখন না পড়তে পারলেও পরবর্তীতে পড়েছি। তখন ইন্টারনেট ছিল না। এই ধরণের বই যেখানে ইতিহাস ও বিশ্ব পরিচিতি থাকতো পড়তে ভালো লাগতো। কিন্তু পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছে এই বইটিতে কিছুটা লিমিটেশন ছিল ভারতবর্ষের মুসলমান শাসকদের ব্যাপারে। আমার ভুল হতে পারে।
এর পরের পর্বে থাকবে আমার গুলশান বাস। সাথে আছেন তো ?
ছায়াছবি সিরিজ
February 5, 2025
আমরা নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করি। অনেক রকম পরিকল্পনা করি। আমরা ভুলে যাই যে আমাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুধু আমাদের উপর নির্ভর করে না। যাই হোক, তেমনই কোনো পরিকল্পনা বিঘ্নকারী প্রাসঙ্গিক কিছু কারণে আমার এই সিরিজ লেখায় ছেদ পড়েছিল।
কিছু কারণে আবেগ তাড়িত আছি। আগামীকাল থেকে আমার নানাবাড়ির গল্প শুরু করবো।
"নিজের নিয়ন্ত্রণে আছে এমন মাঠেই খেলতে হয়।"
- ৫৯ বছরের একটি উপলব্ধি