ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ৬

February 7, 2025

১৯৭৩ ৭৪ সালে আমরা গুলশানে নানার বাসায় ছিলাম। এই সময় আমার আব্বা পশ্চিম জার্মানিতে আঠারো মাস ব্যাপী একটি প্রশিক্ষণে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে কারিগরি সহায়তা দানের অংশ হিসাবে বিভিন্ন বিভাগের প্ৰকৌশলীদের পশ্চিম জার্মানি এই প্রশিক্ষণের সুযোগ দিয়েছিলেন। সে বছর রেলওয়ে থেকে আব্বু এবং রফিক চাচা গিয়েছিলেন। এই বৃত্তি বেশ ক বছর চলেছিল। পর পর কয়েক ব্যাচ গিয়েছিলো। পরবর্তীতে জার্মান সরকার এই বৃত্তি বন্ধ করে দেয়। হতে পারে জার্মান সরকার এর প্রয়োজনীয়তা আর অনুভব করে নি বা ফান্ড শেষ হয়ে গিয়েছিলো অথবা অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু লোকমুখে শোনা যেত যে আমাদের আচরণে বিরক্ত হয়ে এই বৃত্তি বন্ধ হয়েছিল। সে গল্প আরেকদিন করবো। আপাতত গুলশানে ফিরে আসি।

এই বাসাটি গুলশান ১২৮ নম্বর সড়কে। এখনকার গুলশান আর পঞ্চাশ বছর আগেকার গুলশান বিস্তর ফারাক। আমাদের সড়কটির মাথায় বাম পাশে এখন যেখানে একটি স্কুল আছে এবং আগে যেখানে এশিয়া ফাউন্ডেশনের অফিস ছিল - সেই জায়গাটি একেবারে খালি ছিল। ডানপাশে একটি তৈরী বাসা ছিল। কিন্তু তারপর দুইটি প্লট খালি ছিল। তামান্না ফার্মেসী থেকে ক্যান্ডিফ্লস পর্যন্ত যে জায়গাটা তার পিছনটা পুরোটাই ফাঁকা মাঠ ছিল। আমরা ১২৮ নম্বর থেকে বের হয়ে কিছুটা এগুলেই ডি আই টি মার্কেট পরিষ্কার দেখতে পেতাম। এখন যেখানে উদয় টাওয়ার সেখানে বা তার পাশে একটা পেট্রল পাম্প ছিল আর তার পাশে একটা মাঠ ছিল।

অন্য দিকে আমাদের বাড়ির ( নানা বাড়িকে নিজেদের বাড়ি বলা যায় কি ?) পর আরেকটি করে বাড়ি ছিল দুপাশে। আর তারপর ঢালু মাঠ আর লেক। এখন সেখানে আরো অনেকগুলো বাড়ি হয়েছে আর হয়েছে ওয়াক ওয়ে। লেকটি এখনকার মত দুর্গন্ধ যুক্ত ছিল না। চমৎকার সুন্দর চলমান একটি লেক ছিল। পালতোলা নৌকা দেখেছি। স্পিড বোটের পিছনে দড়ির মত কি একটা লাগিয়ে আর পায়ে বোর্ড লাগিয়ে বিদেশিরা ছুটতো পানির উপর। বড়োরা বলতো ওরা ওয়াটার ওয়াটার স্কিইং করছে। বিদেশিরা মাছ ও ধরতো। আমি ছোটবেলা থেকে একটু ট্যালা মার্কা দুষ্ট ছিলাম। একবার এক বিদেশী মাছের খাবার ( ধরার জন্য) পাশে রেখে বড়শি ধরে চুপ করে বসে ছিল। আমার এক মামাতো ভাই দেখলাম তার পাশে চুপ করে বসে আছে। আমিও কিছুক্ষন চুপ করে থেকে কি মনে করে সেই মাছের খাবার পা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিলাম। লোকটি উঠে বললো "Where is my--" কি বলেছিলো ঠিক মনে নেই বা বুঝতে পারি যিনি। কিন্তু তার হুঙ্কার দেখে আমি দৌড় দৌড়। এক দৌড়ে বাসায়। আম্মা বললেন কি হয়েছে ? আমি কি আর বলি কি হয়েছে? কয়েকদিন ভয়ে ভয়ে আর লেকের পাড়ে যাই নি।

বিকেলে আম্মা, খালাম্মা , সামনের বাসার কর্নেল রেজার মেয়েরা ( মুন্নি খালা আর ইফাত খালা) , ১২৬ নম্বর রোডের সালাম সাহেবের মেয়ে জলি খালা সবাই মিলে লেকের পাড়ে হাটতে যেত। ঐপারে বাড্ডা নামক জায়গাটাকে আমরা ভাবতাম গ্রাম। সেখানে ছোট ছোট টিনের বাড়ি দেখা যেত। শীতকালে বিভিন্ন রকম সবজি আর শস্য চাষ হতে দেখা যেত। এখন যেখানে লিংক রোড সেখানে গুদারা ঘাট ছিল। নৌকা করে এপার ওপর হওয়া যেত।

কি মনে হচ্ছে ? এখন যেমন বসুন্ধরা বা জলসিঁড়ি বা উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর? হ্যা নগরায়নের স্বার্থে গত সাত সত্তর বছরে ঢাকার আশেপাশের গ্রাম গুলোর জমি অধিগ্রহণ করে গড়ে উঠেছিল ধানমন্ডি , বনানী , গুলশান , উত্তরা আর DOHS গুলো। এখনকার বসুন্ধরা বা dohs এর সাথে একটু পার্থক্য আছে। কারণ Gulshan , Banani ,Uttara এগুলো সব DIT / রাজউক অধিকৃত। DOHS কিভাবে গড়ে উঠেছে জানা নেই।

আমার মাথায় সবসময় উল্টা পাল্টা চিন্তা ঘুরে। আচ্ছা এখানে যে মানুষগুলো আগে থাকতো তারা কোথায় গেলো?

পুনশ্চ: যে ছবি গুলো শেয়ার করলাম সেগুলো অনেক পরের ছবি। আমি এই ছবিতে ক্লাস নাইন এ পড়ি। আর এ গল্প হচ্চে আমার সাত আট বছরের।