ছায়াছবি তালিকায় ফিরে যান

ছায়াছবি ৯

February 25, 2025

নিজের সাথে অনেক কথা বলি। সবকথা লেখা হয় না। হয়তো কখনো কোন চিন্তা বা ভাবাবেগ মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করে কিন্তু তখন কেরানি আমার লেখার সময় হয় না। আর যখন সময় হয় তখন ভেতর টা শূন্য থাকে। চেষ্টা চরিত্র করে কোনো কিছু ভেতর থেকে বের করা কঠিন। যাই হোক বলেছিলাম গুলশানে আমাদের প্রতিবেশীদের কথা বলবো। এ কথা বলার তাগিদ কেন অনুভব করি ? আমার মনে হয় পূর্ববর্তী সময়ের একটি অবিচ্ছদ্য অনুষঙ্গ মানুষ। আমরা নতুন কিছু তৈরী করি বা করতে চাই তার জন্য ও কি আগের কথা জানা দরকার নেই ? কোন ধারাবাহিকতায় আজকের আমরা ? কেমন ছিল আমাদের পূর্বসূরিরা আর আমাদের আগের ঢাকা ?

আগের বর্ণনায় বলেছিলাম যে ( কমেন্টে লিংক দেখুন) ১৯৭২ সালে যখন আমার নানার পরিবার গুলশানে বসবাস করা শুরু করে তখন এলাকার বেশির ভাগ জায়গা ফাঁকা ছিল। আমাদের রোডে যে কয়টা বাসা ছিল তার মধ্যে আমাদের ঠিক মুখোমুখি ছিল কর্নেল রেজার বাসা।

তিনি একজন অবসর প্রাপ্ত কর্নেল ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে তাঁকে সেনা কল্যাণ সংস্থা ( পূর্ববর্তী ফৌজি ফাউন্ডেশন ) পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।আমাদের বাসার সামনেই তাঁর চমৎকার একটি দোতলা বাসা ছিল। গোল মোজাইকের বারান্দা ছিল। বাসার সামনে দিয়ে একটি ঘোরানো সিঁড়ি দোতালায় উঠে গিয়েছিলো। আমার শৈশব স্মৃতিতে মনে আছে কর্নেল নানার বাসায় অনেক বড় একটি এলসেশিয়ান ছিল, গ্রান্ড পিয়ানো ছিল আরেক টা বড় বোট ছিল যেটা মাঝে মাঝে লেকে নামানো হত। কর্নেল রেজা ছিলেন টকটকে ফর্সা- ভাষা ভাষা মনে পড়ে। কর্নেল নানু ছিলেন ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। তাঁদের সন্তানেরা ছিলেন তালাল , ইফ্ফাত, মুন্নি এবং বাবু।

কর্নেল নানু গাড়ি চালাতে পারতেন। আমার মা প্রায় গল্প করতেন যে কর্নেল নানু খুব সতর্ক ভাবে গাড়ি চালাতেন। আম্মা এবং তার মেয়েরা যদি গাড়িতে বসে বেশি জোরে কথা বলতেন তো নানু নাকি বলতেন' তোমরা আস্তে কথা বোলো , আমার কন্সেন্ট্রেশন চলে যাচ্ছে।"

মুন্নি খালার ভালো নাম জায়েন রেজা। ( বর্তমানে জায়েন চৌধুরী) I আমরা যখন প্রথম গুলশানে থাকতে শুরু করলাম তার কিছু পরেই বোধ করি তাঁর মাধ্যমিক পরীক্ষা ছিল। তিনি ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী ছিলেন। স্বাধীনতার পর খুব সম্ভব এমন নির্দেশ ছিল যে যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছিল তাঁদেরও বাংলা নিতে হবে। আম্মা বলতেন যে মুন্নি খালা খুব অল্প কদিন আম্মার কাছে বাংলা দেখে নিয়ে পাশ করে গিয়েছিলেন। মুন্নি খালা পরবর্তীতে তে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার হয়েছিলেন। বোধ করি সেটা আমার একটা ইন্সপিরেশন ডাক্তারি পড়ার। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুন্নি খালার সাথে টেলিফোনে কথা বলেছি অল্প কিছুদিন আগে। তিনি আমাকে কতটা চিনতে পেরেছেন জানি না. তবে আমার মা খালাদের, মামীদের এবং নানুর কথা তার খুব ভালো ভাবেই মনে আছে।

আমাদের পাশের বাসটি ছিল কোনো অবাঙালির এবং সেটা পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল। সেটা বেশ কিছুদিন খালি ছিল। পরে সেটা সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবন হিসাবে ব্যবহৃত হত। পুলিশের আই জি, সচিব, এমন আরকি। এখন সেটা কোনো একটি প্রাইভেট কোম্পানি কিনে নিয়েছে এবং তার কর্ণধার সেখানে বসবাস করেন।

গুলশানে আরো যাদের কথা মনে আছে তৎকালীন প্রতিবেশী হিসাবে তাঁরা প্রায় সবাই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা- ইঞ্জিনেয়ার, ডাক্তার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইত্যাদি। বেশির ভাগ বাড়িই বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন অধিবাসী এসেছেন। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে উচ্চবিত্ত এবগ মধ্যবিত্তের আকার আকৃতি পরিবর্তন হয়েছে।

গুলশানের মূল প্ল্যান এ লেকের পাড়ে অনেক জায়গা খালি রাখা ছিল। সেই মূল প্ল্যান এখন আর নেই। লেকের পাড় নয় শুধু ,লেকের অনেকখানি পর্যন্ত বোধ করি বাড়ি উঠে গেছে। লেকটি এখন দুর্গন্ধযুক্ত বদ্ধ জলাশয় বলে মনে হয় আমার কাছে।